‘সামনে রমজান মাস। একদিকে রোজা, অন্যদিকে কর্মব্যস্ত জীবন। এর মাঝে আবার যদি প্রতিদিন বাজারে যেতে হয়, তাহলে কী অবস্থা হয়, তা যিনি বাজার করেন তিনিই বলতে পারবেন। তাই এসব ঝামেলা থেকে মুক্ত থাকতে প্রতিবছর এ সময় পুরো মাসের প্রয়োজনীয় এবং বড় সব দ্রব্যসামগ্রী কিনে রাখি।’ বলছিলেন কারওয়ান বাজারের ক্রেতা শাহিনুর বেগম। ‘পুরো মাসের বাজারটা একবারে করে রাখলে টাকার অপচয় থেকে রক্ষা পাওয়া যেতে পারে। সেই সঙ্গে ঝামেলা ও চিন্তামুক্ত থাকা যায়।’ বলেন রন্ধনশিল্পী রাহিমা সুলতানা।

আগেভাগে পরিকল্পনা
রমজান শুরুর আগেই পরিকল্পনা করে নিন মাসকাবারি বাজারের। কী কী দ্রব্য আপনার দরকার, তার হিসাব করে কত টাকা লাগতে পারে তার একটা সম্ভাব্য বাজেট করুন। এতে একবারে একটু বেশি টাকা লাগলেও মাসের শেষে ঠিকই দেখবেন, আপনার বেশ কিছু টাকা বেঁচে যাবে। বাজারের জন্য বাড়তি সময় বা ঝামেলা কমে যাবে।
রমজান মাসে যেহেতু ইফতারের বিষয় আছে, তাই সেভাবে পরিকল্পনা গ্রহণ করুন। রোজার সময় এসব দ্রব্যের মূল্য সাধারণত ওঠানামা করে। কাজেই সময় নিয়ে বসে হিসাব কষে নিন, কোন জিনিস কতটুকু পরিমাণে লাগতে পারে। পাইকারি দোকান থেকে কেনার চেষ্টা করুন। আবার এ সময় অনেক ডিপার্টমেন্টাল স্টোরে বিশেষ ছাড়ে পণ্য বিক্রি চলে। চাইলে সেখানেও যেতে পারেন।

তালিকা করে নিন
রাহিমা সুলতানা জানান, রোজা রাখলে শরীরে পানির ঘাটতি হয়। তাই বাজার করার আগে তালিকায় অবশ্যই শুকনা ফলমূল, ফলের রস, শরবত ইত্যাদি রাখতে হবে। এতে শরীরে পানির ঘাটতি পূরণ হবে। দেখুন পুরো মাসে আপনার কোন কোন জিনিস দরকার পড়বে। সেই সঙ্গে এটি সংরক্ষণ করার ব্যবস্থা থাকা দরকার। সাধারণত এ ধরনের জিনিসের মধ্যে ছোলা, আটা, ময়দা, বেসন, আলু, পেঁয়াজ, তেল, চিনি, গুড়, খেজুর, লবণ, মুড়ি, চিঁড়া, আদা, রসুন ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য। এগুলো আপনি সারা মাসই ব্যবহার করতে পারবেন। অপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের তালিকা করে খরচ বাড়াবেন না। তাই একটু বুঝেশুনে তালিকা তৈরি করুন। অনেকে তেলেভাজা খাবার পছন্দ করেন না, আবার অনেকে করেন। তবে এ সময় ভাজা খাবার কম খাওয়া ভালো। এ মাসে কী ধরনের খাবার খাবেন, এর একটি তালিকা পরিবারের সবাই মিলে বসে ঠিক করে নিতে পারেন। প্রতিদিন আপনার কোন দ্রব্য কতটুকু প্রয়োজন, তা হিসাব করে নিন। এটা সাধারণত পরিবারের সদস্যদের চাহিদার ওপর নির্ভর করে। প্রতিদিন যদি আপনার ৩০০ গ্রাম আটা লাগে, তাহলে মাসে আপনার কী পরিমাণ আটা লাগবে, তা সহজেই বের করতে পারবেন।
অনেকে মনে করেন, ডুবো তেলে চপ, বেগুনি, পেঁয়াজু ভাজলে তেল বেশি লাগে এবং তা খেলে সমস্যা হবে। আসলে তা নয়। ডুবো তেলে ভাজলে তেল কম লাগে এবং খাবারে তেল কম পরিমাণে প্রবেশ করে, তবে ভাজার তেল অবশ্যই গরম হতে হবে। লাগাতার ভাজাভুজি না খেয়ে দই-চিঁড়া, ফলমূল, শরবত ইত্যাদি খাবারের মাধ্যমে ইফতারে বৈচিত্র্য আনতে পারেন। রোজার মাসে বাসায় ইফতারের দাওয়াত থাকলে অথবা প্রতিবেশীদের বিলি করার কথা মাথায় রেখে পরিমাণ হিসাব করতে ভুলবেন না। ওই দিন বিশেষ কিছু করতে চাইলে তাও তালিকায় যোগ করে নিন।

কী কিনবেন, কতটুকু
কী কিনবেন, কতটুকু পরিমাণে কিনবেন, ভেবে পাচ্ছেন না? তাহলে দেখে নিতে পারেন রন্ধনশিল্পী রাহিমা সুলতানার দেওয়া পাঁচজনের একটি পরিবারে বাজারের তালিকা।
পণ্য পরিমাণ
আটা ৮-১০ কেজি
ছোলা ৫-৭ কেজি
ডাল ৫ কেজি
বেসন ৫ কেজি
পেঁয়াজ ১৫ কেজি
তেল ৮-১০ লিটার
চিনি ১০ কেজি
খেজুর ৫ কেজি
গুড় ২ কেজি
আলু ১০ কেজি
চিঁড়া ৪-৫ কেজি
মুড়ি ৪ কেজি
রসুন দেড় কেজি
আদা দেড় কেজি-২ কেজি
লবণ ২ কেজি।
এ ছাড়া মরিচ গুঁড়া, হলুদ গুঁড়া, ধনে গুঁড়া, জিরা ইত্যাদি ৫০০ গ্রাম করে কিনতে পারেন।
বাসায় রেফ্রিজারেটর থাকলে বেগুন, পটল, ধনেপাতা, শিম, করলা, ইত্যাদি সবজি রাখতে পারেন ৭-১০ দিনের জন্য।

ইফতারে কী খাবেন
ইফতারে অবশ্যই লেবু বা গুড়ের শরবত, ফলের রস আপনার ভেতরে সতেজতা ফিরিয়ে আনবে। মৌসুমি ফল ৪-৫ প্রকার, খেজুর, দই, চিঁড়া ভেজানো, বিভিন্ন চপ কম পরিমাণে, হালিম, কাঁচা ছোলার সঙ্গে আদা, পেঁয়াজ, মরিচসহ বিভিন্ন প্রকার সালাদ খেতে পারেন।
চাইলে ইফতারে সামান্য কিছু খেয়ে আপনি রাতের খাবার খেতে পারেন।

৬ আগস্ট ঢাকার কারওয়ান বাজার ঘুরে পণ্যের দামদর জানিয়ে দেওয়া হলো।
ছোলা ৪২ টাকা
ডাল (মসুর) ৭৫, ৯০, ৯৫ টাকা
বেসন ৩০-৬৫ টাকা (রকমভেদে)
পেঁয়াজ ২৬ টাকা
তেল ৮৩ টাকা
চিনি ৪৮ টাকা
আলু ১৫ টাকা
মুড়ি ৪৫-৫০ টাকা
খেজুর ৬৫ টাকা থেকে শুরু
গুড় ৫০-৫৫ টাকা
আদা ১০৫ টাকা
রসুন ১৪৫ টাকা
এ দাম কিছুটা কম-বেশি হতে পারে।

লক্ষ রাখুন
 রমজান মাস শুরুর আগেই বাজারটা সেরে ফেলুন।
 প্রয়োজনীয় পণ্য খুচরা না কিনে পাইকারি দোকান থেকে কিনুন।
 ছোলা, ডাল, পেঁয়াজ, বেসন ইত্যাদি পথ্য শুকনো স্থানে সংরক্ষণ করুন।
 মাঝেমধ্যে এগুলো রোদে দিতে পারেন।
 ভাজা খাবার এড়িয়ে চলার চেষ্টা করুন।
 খাবারের তালিকায় অবশ্যই ফলমূল ও সবজি রাখুন।
 তাজা জিনিস দেখে কিনুন।
 ডাল, ছোলা, বেসনে পোকা আছে কি না দেখে নিন।
 অনেক দিন রাখতে পণ্য ভালোভাবে সংরক্ষণ করুন।

হাসান ইমাম
সূত্র: দৈনিক প্রথম আলো, আগস্ট ১০, ২০১০