কয়েকটি খাবারের সঙ্গে পরিচয়

সস

মুখরোচক করার জন্য কোন কোন খাবারের সাথে সস পরিবেশনের নিয়ম প্রচলিত। সস খাবারের সাথে একটি বাড়তি সংযোজন। তরল, ঘন, থকথকে সসের স্বাদ বৈচিত্রময়। টক, ঝাল, মিষ্টি এবং ঝাজালো স্বাদের সস ভাজা-ভুনা স্নাকস খাবারের সাথে পরিবেশন করা হয়। টমেটো সস, টার্টার সস, হলান্ডেইজ সস, গ্রীন সস, তেঁতুলের সস সিঙ্গারা, সমুছা, ডালপরী এসব ডুবোতেলে ভাজা খাবারের সাথে বেশ সমাদৃত। চকলেট সস, ক্যারামেল সস, পাইন এ্যাপেল সস, কাস্টার্ড সসের স্বাদ মিষ্টি। আইসক্রিম, কেক, পুডিং মিষ্টিসস দিয়ে পরিবেশন করা যায়। ময়দা, দুধ, মাখন দিয়ে সাদা সস তৈরি হয়। সাদা সস রান্নায় ব্যবহার করা হয়। সস শুধু খাবার মুখরোচক করে না, সসের প্রলেপ দিয়ে খাবার সাজানো যায়। আইসক্রিমের উপরে লাল স্ট্রবেরি সস বা হলুদ পাইন এ্যাপল সস অথবা চকলেট সস দিয়ে পরিবেশন করলে সুন্দর দেখায়।

সালাদ

টমেটো, খীরা, গাজর, শসা, বীট, বাঁধাকপি, লেটুসপাতা এসব কাঁচা সবজি দিয়ে সালাদ হয়। বিভিন্ন রকমের কাঁচা সবজি সুন্দরভাবে কেটে সাজিয়ে সালাদ করা যায়। বিদেশে সালাদের সাথে মেয়নেজ বা ড্রেসিং মিশিয়ে খায়। সালাদের সবজির রং ও তাজাভাব দেখতে বেশ ভাল লাগে। সালাদে কাঁচা সবজি থাকে বলে ভিটামিন সি ও অন্যান্য খাদ্যপুষ্টি বেশী পাওয়া যায়। শুধুমাত্র সবজি দিয়েই সালাদ হয় না। মৌসুমী ফল, পনির, ছানা, সিদ্ধ ডিম, সিদ্ধ মাছ, ঠান্ডা মাংস ইত্যাদি দিয়েও সালাদের ডিস সাজানো যায়। এমন কি এক প্লেট সালাদ দিয়ে একজনের দুপুরের খাওয়া সম্পন্ন হতে পারে। যে ফল খোসা ছাড়াবার পর বাতাসের সংস্পর্শে আসলে কালচে হয়ে যায় সে ফল কাটার পর সিরকা বা লবণ পানিতে ভিজিয়ে রাখতে হবে অথবা লেবুর রস দিয়ে মাখিয়ে রাখতে হবে। সালাদের জন্য পাকা কলা, আম কেটে সিরাপে ডুবিয়ে রাখলে কালচে হবে না।

স্যান্ডউইচ

ঈস্ট দিয়ে পাউরুটি, বানরুটি, ডিনার রোল তৈরি হয়। এসব রুটির ভিতর ডিম, মাছ, মাংস, পনির, সবজি পিকেলস, মাখন, মেয়নেজ, সালাদ ড্রেসিং দিয়ে স্যান্ডউইচ তৈরি হয়। স্যান্ডউইচের জন্য পাউরুটি ধারালো ছুরি দিয়ে পাতলা করে কাটতে হবে। স্যান্ডউইচের জন্য যেসব পুরের রেসিপি বইয়ে দেয়া্‌ আছে তাছাড়াও নিজের পছন্দমতো নানারকম পুর দিয়ে স্যান্ডউইচ করা যায়। তবে পুরে আকর্ষণীয় রঙের সবজি ও বিভিন্ন স্বাদের খাবার থাকলে সুন্দর হয়। স্যান্ডউইচ প্লাস্টিকের ব্যাগে মুড়ে অথবা পরিবেশনের আগে পর্যন্ত ভিজা কাপড়ে ঢেকে রাখা দরকার। স্যান্ডউইচ তৈরি করার সময় প্রত্যেক টুকরা রুটিতে মাখন বা মেয়নেজ লাগাতে হবে। এক টুকরা রুটির মাখন লাগানো পিঠে পুর দিয়ে আর একটি মাখন লাগানো টুকরা দিয়ে ঢাকতে হবে। এভাবে দুতিনটি স্যান্ডউইচ একটার উপর আর একটা রেখে ছুরি দিয়ে চারপাশের শক্ত অংশ কেটে ফেলার পরে স্যান্ডউইচের মাঝখানে, কোনাকুনি বা লম্বায় কেটে দুভাগ করতে হবে।

ক্লাব স্যান্ডউইচ তিন টুকরা রুটি দিয়ে করা যায় এবং রুটির একপিঠ সামান্য সেকে নিতে হয়। এই স্যান্ডউইচ সামান্য গরম পরিবেশন করার নিয়ম। ক্লাব স্যান্ডউইচ ও হ্যামবারগার স্যান্ডউইচ পিকনিকে, স্কুলে ও অফিস লাঞ্চে বা দুপুরের আহারে পরিবেশন করা হয়। টি-পার্টিতে তিনকোনা, গোল, চারকোনা ইত্যাদি বিভিন্ন আকারে শোভনীয় স্যান্ডউইচ পরিবেশন করা যায়।

সুপ

সুপ তিন রকমের—স্বচ্ছ তরল সুপ, ঘন সুপ এবং ক্রিম সুপ। বড় হাঁড়িতে গরুর হাড় (গরু, খাসী ও মুরগীর হাড় একসঙ্গেও নেয়া যায়), খোসাসহ গাজর এবং পেঁয়াজ টুকরা করে, খোসাসহ ডিম ভেঙ্গে এবং সামান্য তেজপাতা ও অনেক পানি দিয়ে চুলায় বসিয়ে দিলে, ঘন্টা চারেক ফুটালে পর উপরে একটা স্তর পড়ে। স্তর যাতে না ভাঙ্গে সেজন্য হাঁড়ি সাবধানে নামিয়ে কিছুক্ষণ রেখে, ঠান্ডা স্তর একটু সরিয়ে পাতলা কাপড় দিয়ে ছেঁকে নিলে স্বচ্ছ তরল সুপ পাওয়া যায়, এই সুপে লবণ, স্বাদ লবন (ইচ্ছা) এবং সিদ্ধকরা পাতলা স্লাইস সবজি দিয়ে পরিবেশন করা যায়। মিটস্টকে করণফ্লাওয়ার গুলে দিয়ে সুপ ঘন করা হয়। এক কাপ মিটস্টকে ১ টে. চামচ করণফ্লাওয়ার দিলে সুপ ঘন থকথকে হয়। সাদা সস দিয়ে তৈরি সুপকে ক্রিম সুপ বলা হয়। সব সুপেই সবজি দেয়া যায়। সাধারণত খাওয়ার শুরুতে সুপ পরিবেশন করার নিয়ম। খাওয়ার শেষেও সুপ খাওয়া চলে। স্বচ্ছ তরল সুপে ক্যালরির পরিমাণ কম বলে ওজন কমাতে হলে খাওয়ার শেষে সুপ খেয়ে তৃপ্তি মেটানো হয়। সবজি দিয়ে তৈরি ক্রিম সুপের সঙ্গে ক্রেকার বিস্কুট বা রুটি-মাখন পরিবেশন করে দুপুরের বা রাতের খাবার হতে পারে।

সুফলে

সুফলে মাছ, মাংস, পনির ও শাক-সবজি দিয়ে তৈরি ওভেনে বেক করা ফাঁপানো খাদ্য। ডিমের সাদা অংশ ঘন জমাট করে ফেটে অত্যন্ত নিপুণতার সাথে খাবারের সঙ্গে মিশিয়ে সুফলে তৈরি করা যায়। ঠান্ডা হলে বেক করা সুফলের ফাঁপানো ভাব থাকে না। এজন্য ওভেন থেকে নামিয়েই পরিবেশন করতে হবে। ফাপানো কাস্টার্ড, পুডিংকেও সুফলে বলা হয়। মিষ্টি সুফলে রেফ্রিজারেটরে রাখতে হবে এবং ঠান্ডা পরিবেশন করতে হবে।

হ্যামবারগার

সাধারণত গরুর মাংসের কিমা দিয়ে তৈরি গোলাকার চ্যাপ্টা হ্যামবারগার স্টেক জনপ্রিয় খাবার। হ্যামবারগার স্টেক সাধারণত বানরুটির মধ্যে দিয়ে পরিবেশন করা হয়। পিকনিক এবং অফিস লাঞ্চের জন্য হ্যামবারগার উপযুক্ত খাবার। হ্যামবারগার টমেটো, খীরা, লেটুসপাতা দিলে একটি পূর্ণাঙ্গ সুষম খাবার হয়।

তাকো

তাকো মেক্সিকান খাবার। ১৫ সে.মি. ব্যাসের পাতলা মচমচে ভাজা রুটির মধ্যে শুকনা করে ভাজা সিদ্ধ ডাল, খিরা, টমেটো, গাজর, বাঁধাকপি, ক্যাপসিকাম, পেঁয়াজ এসব সবজি কুচি করে দিয়ে উপরে ঝুরি করা পনির ছিটিয়ে খেতে খুব সুস্বাদু। বিদেশের রেস্তরাঁয় এই মেক্সিকান খাবারটি বেশ জনপ্রিয়। ঝুরা মাছ, মাংসের কিমা, কটেজ চিজ, নরম পনির, দই এসব নানা খাবার রুটির মধ্যে দিয়ে তাকোর স্বাদের বিভিন্নতা আনা যায়। তাকোর রুটি সেকা তেলে বা ডুবো তেলে দুভাজ করে ভাজতে হবে। যাতে স্যান্ডউইচের মত ভিতরে মাছ, মাংস, সবজি, পনির দিয়ে পরিবেশন করা যায়। রুটি ভাজার সাথে সাথেই ভিতরে খাবার ভরে খেতে হবে। নয়ত রুটির মচমচে ভাব থাকবে না আর তাকোর আসল স্বাদ পাওয়া যাবে না। তাকোর রুটি তৈরির জন্য প্রয়োজন ভুট্টার আটা।

পিজ্‌জা

বাংলাদেশে যেমন পরটা কাবাবের সুনাম তেমনি ইটালীর নামকরা খাবার পিজ্‌জা। পৃথিবীব্যাপী পিজজার জনপ্রিয়তা রয়েছে। ঘোর বর্ষণে বা তুষারপাতে ঠান্ডা আবহাওয়ায় গরম পিজজার সাথে আর কোন খাবারের তুলনা হয় না। বিভিন্ন লোকের চাহিদা পুরণের জন্য আছে ভেজিটেবল পিজজা, মিট পিজজা, চীজ পিজজার রেসিপি। পিজজা বেক করা খাবার। পিজজার জন্য ঈস্টের খামির দিয়ে রুটি বেলে গোলাকার পিজজা প্যানে রুটি বিছিয়ে, টমেটো সস দিয়ে রান্না করা কিমা, রুটির উপর ঢেলে ছড়িয়ে দিতে হবে। তার উপরে পনির কুচি, ওরিগেনো, থাইম, শুকনা মরিচের গুঁড়া ও তেল ছিটিয়ে দিয়ে বেক করতে হবে। গরম পিজজায় যে স্বাদ, ঠান্ডা হলে তেমনটি পাওয়া যায় না। তাই পরিবেশনের আয়োজন করেই পিজজা ওভেনে ঢুকাতে হবে, যেন নামিয়েই খাওয়া যায়।

পাই

বাংলাদেশের পিঠার মত আমেরিকা, ইউরোপ, ইংল্যান্ডে পাই একটি ঐতিহ্যময় যুগধর্মী খাবার। প্রাচীনাদের কুশলী হাতের যত্নে তৈরি পাই দেখতে আকর্ষণীয়, স্বাদেও লোভনীয়। পাই সাধারণত পার্টির মেনুতে মিষ্টি খাবার হিসেবে অন্তর্ভুত থাকে। মিষ্টি ছাড়াও কিমা-মাংস বা মুরগীর মাংস দিয়ে সুস্বাদু পাই তৈরি করা যায়।

পাই ওভেনে বেক করা খাবার। গোলাকার বিভিন্ন সাইজের পাইপ্যানে, পাই বেক করা হয়। একটি প্রমাণ সাইজের পাই প্যান এর ব্যাস ২০ সে, মি.। পাই এর মুল উপকরণ ময়দা ও মাখন দিয়ে তৈরি পাইপেস্ট্রি। এতে থাকে ৩ ভাগ ময়দা ও ২ ভাগ ডালডা। পাইপেস্ট্রি দিয়ে রুটি বেলে পাইপ্যানে বিছিয়ে তার উপরে ফল, মার্মালেড, জ্যাম, হালুয়া, কাস্টার্ড বা রান্না করা কিমা-মাংস দিয়ে উপরে আরেকটি রুটি দিয়ে ঢেকে দেওয়া হয়। এরপর ওভেনে বেক করা হয়। কোন কোন পাই এর উপরে পাইপেস্ট্রি দিয়ে ঢাকা হয় না। বেক করার পরে পাইক্রাস্ট বেশ খাস্তা হয়, আঙ্গুলের চাপে ভেঙ্গে যায়। বেক করার পরে পাইক্রাস্ট বেশ খাস্তা হয়, আঙ্গুলের চাপে ভেঙ্গে যায়। এ্যাপেল পাই, পাইনএ্যাপেল শিফন পাই, পাস্পকিন পাই, লেমন মেরাং পাই, বোস্টন ক্রীম পাই, পিকান পাই, আরও বহুরকমের পাই-এর স্বাদ অতি মনোরম। বিদেশে বিশেষ অনুষ্ঠানে পাই খাওয়ার রীতি প্রচলিত।

পেস্ট্রি

পেস্ট্রি নানা আকারের ছোট ছোট সাইজের শোভনীয় খাবার। কনফেকশনারীর নানা ধরনের খাবার পেস্ট্রির অন্তর্ভুক্ত। পাফ খামির দিয়ে তৈরি পাফ পেস্ট্রির মধ্যে রয়েছে ডেনিশপেস্ট্রি, আমও ক্রিসেন্ট, পামলিফ, সসেজ রোল, ক্রিমরোল ইত্যাদি। ফ্রেঞ্চ পেস্ট্রির সুনাম জগৎ জোড়া। ক্রিম পাফ, জেলী রোল, ফু্রট টার্ট, চকলেট একলেয়ার সব ফ্রেঞ্চ পেস্ট্রি। আরও অন্যান্য পেস্ট্রি। আরও অন্যান্য পেস্ট্রি যেমন ডোনাট, শর্টব্রেড ক্রিম বিস্কুট, শোভনীয় কেক পেস্ট্রি সবার জন্যই উপাদেয় খাবার উৎসবে বিকালে চায়ের সাথে, টি-পার্টিতে, জন্মদিনে, সভা সমিতিতে এবং অতিথি আপ্যায়নের জন্য পেস্ট্রি ঠিক যোগ্য খাবার। দাওয়াতের লাঞ্চ, ডিনারের মেনুতেও পেস্ট্রি ডেজার্ট হিসাবে পরিবেশন করা যায়। মাখন, ডালডা, ময়দা, চিনি, ডিম, পেস্ট্রি তৈরির মূল উপকরণ। এজন্য পেস্ট্রি অত্যন্ত ক্যালরিবহুল খাবার।

পুডিং

ডিম ফেটে চিনি ও দুধের সংগে মিশিয়ে পুডিং তৈরি হয়। ভাপে সিদ্ধ করলে বা বেক কারা পর পুডিং জমে যায়। ঘন দুধ এবং পাউরুটি বা টোস্ট বিস্কুট দিলে পুডিং তাড়াতাড়ি জমে। মোলডে পুডিং-এর উপকরণ ঢালার আগে চিনি ক্যারামেল করে নিলে পুডিং আকর্ষণীয় হয়। মোলডের আকারে পুডিং জমে যায় বলেই দেখতে সুন্দর হয়। পার্টিতে খাওয়ার শেষে পুডিং পরিবেশন করা যায়।

কাস্টার্ড

কাস্টার্ড ঘন এবং মসৃণ হয় কিন্ত্র জমে না। ডিম, করণফ্লাওয়ার ও চিনি এক সাথে ফেটাবার পর দুধের সঙ্গে মিশিয়ে, হালকা আঁচে চুলায় দিয়ে নাড়তে থাকলে ঘন হয়ে কাস্টার্ড হয়। কাস্টার্ড ঘন এবং থকথকে দু’রকমই করা যায়। এক লিটার দুধে একটি ডিম ও তিন টেবিল চামচ করণফ্লাওয়ার দিলে মাঝারি ধরনের ঘন কাস্টার্ড হবে। ঘন ঠান্ডা কাস্টার্ড আম, কলা, পাকা পেপের টুকরা মিশিয়ে পরিবেশন করা যায়। থকথকে ঘন কাস্টার্ডের সঙ্গে জেলাটিন, কেক ও নানারকম ফল মিশিয়ে হুইপড ক্রিম দিয়ে ফ্রুটস ট্যাইফল সাজান হয়। সাধারণত দুপুরে এবং রাতের খাওয়ার পর কাস্টার্ড পরিবেশন করা হয়।

মুয

আইসক্রিম ব্লেন্ডারে, মিক্সারে বা হাতে ফেটে মোলডে ভরে পুনরায় ফ্রিজে জমিয়ে মুয তৈরি হয়। মুয ডিনার পার্টির শেষে পরিবেশনের জন্য একটি সুন্দর সুস্বাদু ঠান্ডা ডেজার্ট। নানা ফলের কুচি দিয়ে মুয জমানো যায় অথবা টুকরা ফল দিয়ে সাজিয়েও মুয পরিবেশন করা যায়। তাছাড়া সাধারণত হুইপড ক্রিম বা মেরাং দিয়ে মুয সাজানো হয়।